“মাদকাসক্ত চেনার নানা উপায়’: মোশারফ হোসাইন, ইউএনও ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সরাইল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।
বার্তা সম্পাদক প্রকাশিত: ১:০৫ পূর্বাহ্ণ , ২৩ অক্টোবর ২০২৫, বৃহস্পতিবার , পোষ্ট করা হয়েছে 8 months আগে
“মাদকাসক্ত চেনার নানা উপায়”: মোশারফ হোসাইন, ইউএনও ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সরাইল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।
সরাইল নিউজ টোয়েন্টিফোর ডেস্ক রিপোর্ট:
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই মাদক দ্রব্য ও মাদকাসক্ত নিয়ে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করতে হয়। মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮ অনুযায়ী প্রায়ই সাজা দিতে হয়। কিছুদিন পূর্বে (যখন এসিল্যান্ড ছিলাম) একজন উচ্চশিক্ষিত মাদকসেবীকে সাজা ঘোষণার সময় বলে উঠল, “স্যার, আপনি তো ম্যাজিস্ট্রেট নানা জায়গায় যান, নানা বিষয়ে কথা বলেন। স্যার, মানুষ কেন মাদকাসক্ত হয় তার অনেক কারণ আছে, সমাজের দায়বদ্ধতা আছে……………আপনার কাছে অনুরোধ এই কথাগুলো মানুষকে বলবেন।” আসামী বেশ কিছু কথা বলেছিল এবং আমি মনোযোগ দিয়ে শুনেছিলাম কথাগুলো। ওই আসামীর কিছু কথা ও অনলাইনে থেকে সংগৃহীত বেশকিছু তথ্য নিয়ে আজকের লেখা…
সকলেই একটা কথার সাথে পরিচিত যে, “অল্পতে রোগ মুক্তি বেশিতে রোগের অতিথি, তার নাম মাদক”। এ প্রবচনের সোজাসাপ্টা মিনিং হলো অল্প পরিমাণে মাদক শরীরে ওষুধের কাজ করলে বেশি পরিমাণে মাদক গ্রহণে শরীরে রোগ বালাই বাসা বাঁধে এবং এক সময় ডেকে আনে মৃত্যুকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদকদ্রব্য হলো একটি রাসায়নিক কিংবা জৈব রাসায়নিক দ্রব্য যা গ্রহনে মানুষের স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক অবস্থার উপর প্রভাব পড়ে এবং যা তীব্র আসক্তি সৃষ্টি করে। মাদকদ্রব্য মানব শরীরের বেদনানাশক কর্মের সাথে যুক্ত থাকে। ফলে মাদকের প্রভাবে শরীরে তন্দ্রাচ্ছন্নতা, মেজাজ পরিবর্তন, মানসিক আচ্ছন্নতা, রক্তচাপ পরিবর্তন ইত্যাদি শারীরিক এবং মানসিক পরিবর্তন হয়। মাদক মানব মস্তিষ্কের CNS (Central nervous system) এ এক ধরনের পরিবর্তন সাধিত করে,যার ফলে মাদক সেবনকারী ব্যক্তির শারিরীক ও মানসিক অনুভূতির এক ধরনের পরিবর্তন আসে যাকে মাদকসেবী নেশা হিসাবে বিবেচনা করে।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে ,মাদক সেবনের পরপরই ব্যক্তির মস্তিষ্কের কিছু কিছু জায়গায় অতি দ্রুত এবং বেশি পরিমাণে ডোপামিন নামক নিওরোট্রান্সমিটার বৃদ্ধি পায়,যা একজন ব্যক্তিকে মাদকের আনন্দ দেয়। এবং পরবর্তী কালে ব্যবহারে উৎসাহিত করে। কিন্তু যারা দীর্ঘদিন ধরে মাদকে আসক্ত তাদের বেলায় আবার উল্টোটা দেখা যায়। অর্থাৎ দীর্ঘদিন মাদক নেয়ার ফলে যে ডোপামিন একজন মানুষকে নেশার আনন্দ দিত তা আস্তে আস্তে কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে। মাদকাসক্ত ব্যক্তি আসলে একটা সময়ে আর আনন্দের জন্য নেশা নেয না; এটা তার অভ্যাসে পরিণত হয় এবং এটা থেকে একসময় বের হয়ে আসা অসম্ভব হয়ে পড়ে। প্রথম পর্যায়ে মাদক মানুষকে এমন একটি আনন্দ দেয় যার কাছে মজাদার জিনিসগুলো যেমন খাদ্য , পানীয় এবং যৌন মিলনের আনন্দের মতো জিনিসগুলো ম্লান হয়ে পড়ে। কারণ এই ছোট ছোট আনন্দগুলো মানুষ একই নিওরোট্রান্সমিটার অর্থাৎ ডোপামিন এর মাধ্যমে পেয়ে থাকে। মাদকের আনন্দের সাথে পাল্লা দিয়ে এই আনন্দগুলো কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে এবং মাদকই হয়ে পড়ে মাদকাসক্ত ব্যক্তির একমাত্র চিন্তা চেতনা।
দীর্ঘদিন মাদক ব্যবহারকারীদের ডোপামিন এর কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে মস্তিষ্কের যে সমস্ত জায়গা ডোপামিন এর মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে তথ্য আদান প্রদান করে থাকে সেই জায়গাগুলো অকার্যকর হয়ে পড়ে। ফলে একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। মাদক গ্রহণের পরিমাণের ভিন্নতার কারণে দেহে ও মস্তিষ্কে এর প্রভাব ভিন্ন হয়। খুব অল্প পরিমাণে মাদক উদ্দীপক বস্তু হিসেবে কাজ করে। বেশি পরিমাণে মাদক গ্রহণ করা হলে তা যন্ত্রণাদায়ক হিসেবে কাজ করে। এই বেশি পরিমাণ মাদক শরীরে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে যার পরিণতি হয় মৃত্যু । সর্বোপরি মাদক গ্রহন করলে মানুষের শারীরিক,মানুষিক অবস্থার ব্যাপক নেতিবাচক পরিবর্তন ঘটে এবং মাদক দ্রব্যের উপর নির্ভরশীলতা সৃষ্টির পাশাপাশি দ্রব্যটি গ্রহনের পরিমান ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে।
বিভিন্ন গবেষণায় মাদকাসক্তের নানা কারণ উঠে এসেছে। এসবের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কারন হলো-
১. দলগত চাপ বা মাদকাসক্ত সঙ্গী সাথীদের প্রভাব ও প্রলোভন।
২. মাদকদ্রব্যেরপ্রতিকৌতূহল,অজ্ঞতা,অসচেতনতা,মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষার অভাব।
৩. পারিবারিক দ্বন্দ্ব,কলহ,অবিশ্বাস ও অশান্তি।
৪. দুর্বল ব্যক্তিত্ত্ব এবং মানসিক চাপ সহ্য করার ক্ষমতার অভাব
৫. পরিবারের অন্যদের মাদক গ্রহন,মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকা
৬. পরিবারে অপসংস্কৃতির চর্চা এবং অভিভাবকের নীতিহীনতা
৭. অভিভাবকদের উদাসীনতা,অবহেলা,অতিশাসন কিংবা অতি আদর।
৮. বিবাহ বিচ্ছেদ,বহু বিবাহ এবং পরিবার ভেঙ্গে যাওয়া
9. অপরাধ সম্পৃক্তটা ও অবৈধ উপার্জন।
মাদক গ্রহণের ফলে একজন ব্যক্তির মাঝে বিরাট শারীরিক ও আচরণগত পরিবর্তন হয়। সেই পরিবর্তনগুলো একটু ভালোভাবে লক্ষ্য করলেই বুঝতে পারবেন লোকটি মাদকাসক্ত কি-না। মাদকাসক্তের শারীরিক পরিবর্তনগুলো হলো-
১. খাওয়ার প্রবণতা এবং ঘুমের সময়সীমার পরিবর্তন আসে। ওজন হঠাৎ করে কমে ও বেড়ে যায়।
২. চোখ লাল হয়ে থাকলে এবং চোখের মণি স্বাভাবিকের চেয়ে বড় বা ছোট দেখা যায়।
৩. নাক দিয়ে প্রায়ই রক্ত ঝরে। সাধারণত কোকেইন বা নিঃশ্বাসের সাথে গ্রহণ করতে হয় এমন মাদকের বেলায় এই লক্ষণ দেখা যায়।
৪. চেহারা এবং পোশাকের পরিধান ও যত্নে অবনতি দেখা দেয়।
৫. শরীরে এমন কোন ক্ষত বা কাটা ছেড়া দেখা যায় যা সম্পর্কে তারা জানে না বা কীভাবে আঘাত পেলো তা অন্যকে বলতে না চায় না।
৬. তাদের মুখে বা শরীরে বা পোষাকে অদ্ভুত বা অপরিচিত কোন গন্ধ পাওয়া যায়।
৭. চেহারায় কালো ছোপ ছোপ দাগ তৈরি হয় ।
মাদক গ্রহণের ফলে একজন ব্যক্তির বেশকিছু আচরণগত পরিবর্তন হয়। যেমন-
১. যৌন ক্রিয়ায় অনীহা বা ক্ষমতা হ্রাস পায়।
২. ক্লাস বা অফিসে ঘনঘন যেতে না চাওয়া বা প্রতিষ্ঠানে কোন ঝামেলায় জড়িয়ে পড়া।
৩. কাজে অমনযোগী, ব্যক্তিগত শখ বা খেলাধুলায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলা।
৪. সহকর্মী, শিক্ষক বা বন্ধুদের কাছ থেকে ঘনঘন নালিশ আসতে থাকা।
৫. বাসায় রাখা টাকার হিসাব না মেলা। কারণ নেশার দ্রব্য কিনতে টাকা লাগে। তাই সাধারণত নেশার দ্রব্যের মুল্য পরিশোধের জন্য টাকা, মুল্যবান সামগ্রী, অলংকার চুরি করে থাকে।
৬. পরিবাররে সদ্যসদের সাথে ব্যবহারে অস্বাভাবিক পরিবর্তন আসা। কেননা মাদকাসক্তির সময়গুলোতে খিটখিটে মেজাজের হয়ে থাকে।
৭. বেশির ভাগ সময়ই রুমের দরজা বন্ধ রেখে অন্যদের থেকে দূরে থাকে।
৮. অকারণে বিরক্তিবোধ প্রকাশ করে।
৯. হঠাৎ করে পুরনো বন্ধুদের পরিবর্তে নতুন নতুন বন্ধু সাথে মিশে।
১০. প্রায়ই কারো না কারো সাথে মারামারি বা ঝগড়া ইত্যাদিতে জড়িয়ে পড়ে।
১১. চোখের লাল ভাব কাটানোর জন্য ড্রপ ব্যবহার শুরু করে ।
আপনার পরিবারের কারো মাঝে এধরনের শারীরিক ও আচরণগত পরিবর্তনের বেশ কয়েকটি লক্ষণ একসাথে থাকলে বুঝে নিবেন সে বা তিনি মাদকের দিকে ধাবিত হচ্ছে কিংবা মাদকাসক্ত। আর মাদক গ্রহণ করে থাকে নিম্নোক্ত প্রেক্ষাপটে-
১. বন্ধু বান্ধবের চাপে পড়ে, তাদের সঙ্গ দিতে গিয়ে এবং তাদের থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার ভয়ে অনেকে মাদক গ্রহণে বাধ্য হয় এবং একপর্যায়ে আসক্ত হয়ে পড়ে।
২. কেউ নিছক মজা করে একবার-দু’বার নিতে নিতে আসক্ত হয়ে পড়ে। নিজেকে স্মার্ট দেখানোর জন্য অনেকে মাদক নেয়
৩. অনেকে প্রথমে কৌতূহলের বশে মাদক গ্রহণ করে, ভাবে সে আসক্ত হবে না কিন্তু একপর্যায়ে সেও আসক্ত হয়ে পড়ে।
৪. মানসিক ভাবে বিষাদগ্রস্থ হলে বেকারত্ব, সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া, ব্যবসায় ক্ষতি, পরীক্ষায় ফেল ইত্যাদি নানা কারণে পারিবারিক টানাপোড়েন ইত্যাদি কারণেও মাদকে আসক্ত হয়ে যায় অনেকে।
৫. সিগারেট দিয়েই শুরু হয় নেশার জগতে প্রথম প্রবেশ, তাই সিগারেটকে আপাত নিরীহ মনে হলেও এটা মাদকের জগতে প্রবেশের মূল ফটককে উন্মুক্ত করে দেয়, তাই ধূমপানও হতে পারে মাদকাসক্ত হওয়ার অন্যতম কারণ।
একটা পর্যায়ে শরীর ও মন এমনভাবে মাদক নির্ভর হয়ে পড়ে যে চিকিৎসা ব্যতীত আর কোনোভাবেই মাদক মুক্ত হওয়া সম্ভব হয় না। মাদক একজন ব্যক্তির সকল ইন্দ্রীয় চেতনাকে সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দেয়। যার ফলে ব্যক্তি স্বাভাবিকভাবে চিন্তা করতে পারেনা। তার চিন্তাধারা নেতিবাচক হয়ে পড়ে। আসুন সবাই দেশ ও জাতির কল্যাণে মাদককে না বলি এবং এ নেশা থেকে সবাই দূরে থাকি।











আপনার মন্তব্য লিখুন