২০শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

EN

আজ ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ

বার্তা সম্পাদক

প্রকাশিত: ১:২৩ অপরাহ্ণ , ৭ মার্চ ২০১৮, বুধবার , পোষ্ট করা হয়েছে 6 years আগে

ডেস্ক রিপোর্ট:

আজ ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ। ১৯৭১ সালের আজকের দিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার জীবনের শ্রেষ্ঠতম এবং ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন। তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) তিনি এ আগুনঝরা ভাষণ দেন। শোষিত বঞ্চিত মানুষের মনের অব্যক্ত কথা যেন বের হয়ে আসে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের প্রতিটি উচ্চারণ, প্রতিটি বর্ণ ও শব্দে। বঙ্গবন্ধুর প্রতিটি উচ্চারণ ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হতে থাকে লাখো প্রাণে। গগনবিদারি আওয়াজ তুলে বঙ্গবন্ধুর ভাষণকে সমর্থন জানায় উপস্থিত জনতা। ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ এখন বিশ্বঐতিহ্যের অংশ।
৭ই মার্চের আগের চার-পাঁচ দিনের ঘটনাবলিতে বিুব্ধ মানুষ এ দিন নতুন কর্মসূচির অপেক্ষায় ছিলেন। সকাল থেকেই চার দিক থেকে মানুষের ঢল নামে রেসকোর্স ময়দানে। লাখো মানুষের পদভারে ঢাকা পরিণত হয় উদ্বেলিত নগরে। সব অলিগলি থেকে সকাল থেকে দলে দলে মানুষ রাজপথ কাঁপিয়ে রেসকোর্স ময়দানের দিকে আসতে থাকে। ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা তোমার আমার ঠিকানা’, ‘তোমার দেশ আমার দেশ বাংলাদেশ বাংলাদেশ’ ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর বাংলাদেশ স্বাধীন কর’ প্রভৃতি আগুনঝরা স্লোগানে রাজপথ মুখরিত করে আসতে লাগল শোষিত বঞ্চিত জনতা। স্লোগানে স্লোগানে প্রকম্পিত হয় রেসকোর্স ময়দান।
বঙ্গবন্ধু জনসভায় আসতে একটু বিলম্ব করেন। স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়া হবে কি হবে না এ নিয়ে তখনো রুদ্ধদ্বার বৈঠক এবং বিতর্ক চলছে নেতাদের মধ্যে। পরে বঙ্গবন্ধু ২২ মিনিট তার জীবনের শ্রেষ্ঠতম এবং ঐতিহাসিক ভাষণ শুরু করেন এভাবেÑ‘আজ দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। আপনারা সবাই জানেন এবং বোঝেন, আমরা আমাদের জীবন দিয়ে চেষ্টা করেছি কিন্তু দুঃখের বিষয় আজ ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী ও রংপুরে আমার ভাইদের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে। আজ বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ অধিকার চায়।…আমি বলেছিলাম, জেনারেল ইয়াহিয়া খান সাহেব, আপনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট, দেখে যান কিভাবে আমার গরিবের উপর, আমার বাংলার মানুষের বুকের উপর গুলি করা হয়েছে। কিভাবে আমার মায়ের বুক খালি করা হয়েছে। কী করে মানুষ হত্যা করা হয়েছে। আপনি আসুন, আপনি দেখুন।…২৫ তারিখ অ্যাসেমব্লি ডেকেছে। রক্তের দাগ শুকায় নাই। রক্তে পা দিয়ে শহীদের ওপর পাড়া দিয়ে অ্যাসেমব্লি খোলা চলবে না। সামরিক আইন মার্শা ল উইথড্র করতে হবে…।’
এরপর ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের আগের কয়েক দিনের ঘটনাবলি, শাসক শ্রেণীর সাথে আলোচনা ফলপ্রসূ না হওয়া এবং মুক্তির আকাক্সক্ষায় বাংলাদেশীদের দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরে বঙ্গবন্ধু পরবর্তী আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। ভাষণে তিনি বলেন, ‘এরপর যদি একটি গুলি চলে, এরপর যদি আমার লোককে হত্যা করা হয়-তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে।…আমি যদি তোমাদের হুকুম দিবার নাও পারি তোমরা সব বন্ধ করে দেবে। আমরা ভাতে মারব, আমরা পানিতে মারব। সৈন্যরা তোমরা আমার ভাই, তোমরা ব্যারাকে থাক তোমাদের কেউ কিছুৃ বলবে না। কিন্তু আর তোমরা গুলি করার চেষ্টা করো না। সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না।…আমরা যখন মরতে শিখেছি তখন কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবে না। রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেবো। এই দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশা আল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।’
এ দিন বঙ্গবন্ধুই ছিলেন একমাত্র বক্তা। বঙ্গবন্ধুর ভাষণের আগে আ স ম আব্দুর রব, নুরে আলম সিদ্দিকী, শাহজাহান সিরাজ, আবদুল কুদ্দুস মাখন, আবদুর রাজ্জাক প্রমুখ নেতা মঞ্চ থেকে মাইকে নানা ধরনের স্লোগান দিয়ে উপস্থিত জনতাকে উজ্জীবিত রাখেন।
৭ মার্চের আগের ৪-৫ দিনের ঘটনাবলি : নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর এবং সামরিক বাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেয়াসহ পূর্ব পাকিস্তানের সব ন্যায্য দাবি আদায়ের দাবিতে ৬ মার্চ পর্যন্ত ঘোষিত হরতাল, অসহযোগ আন্দোলন কর্মসূচি অত্যন্ত সফলভাবে শেষ হয়। ৩ মার্চ অনুষ্ঠিত পল্টনের বিশাল জনসমাবেশে আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করে শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, ৬ মার্চের মধ্যে যদি সরকার তার অবস্থান পরিবর্তন না করে তাহলে ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় আন্দোলনের পূর্ণাঙ্গ কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
এ দিকে ৩ মার্চ পল্টনের সমাবেশে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করার পরও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা নিয়ে কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্ব তৈরি হয়। এ বিষয়ে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠকারী ডাকসুর সে সময়কার সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান সিরাজ বলেন (২০১১ সালে একটি সেমিনারে) পল্টনের সমাবেশেই স্বাধীনতা ঘোষণা প্রদানের জন্য প্রচণ্ড চাপ আসতে থাকে স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের নেতাদের ওপর। ওই দিন পল্টনের সমাবেশে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ দেয়ার কথা ছিল না আগে থেকে। কিন্তু সকালে তিনি হঠাৎ করে জানালেন তিনি পল্টনের সমাবেশে ভাষণ দেবেন। তার আসার কথা ছিল আড়াইটায়। কিন্তু তিনি এলেন ৪টার পরে। এ দিকে জনগণ স্বাধীনতার ঘোষণা শোনার জন্য ক্রমে অধৈর্য হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু আসার আগেই স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করা হয় এবং বঙ্গবন্ধু আসার পর আরেকবার তাকে ঘোষণাপত্র পাঠ করে শোনানো হয় এবং তিনি এর সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেন। এক দিকে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ অন্য দিকে দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া বিষয়ে বঙ্গবন্ধু বললেন, ৬ তারিখ কর্মসূচি শেষে ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় তিনি তার অবস্থান পরিষ্কার করবেন।
ঘোষণা অনুযায়ী ১৯৭১ সালের আজকের দিনে অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহাসিক সেই ৭ই মার্চের জনসভা।
রাষ্ট্রপতির বাণী
বাসস জানায়, রাষ্ট্রপতি মো: আবদুল হামিদ বলেছেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ কেবল আমাদের নয়, বিশ্ববাসীর জন্য প্রেরণার চিরন্তন উৎস হয়ে থাকবে।
আজ ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ উপলক্ষে গতকাল মঙ্গলবার দেয়া এক বাণীতে রাষ্ট্রপতি এ কথা বলেন।
আবদুল হামিদ বলেন, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দীর্ঘ ৯ মাস সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা অর্জন করি স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। একটি ভাষণ কিভাবে গোটা জাতিকে জাগিয়ে তোলে, স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে উৎসাহিত করে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ তার অনন্য উদাহরণ।
তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণকে ইউনেস্কো স্বীকৃতি দিয়েছে, বাঙালি হিসেবে এটি আমাদের বড় অর্জন।
বাণীতে রাষ্ট্রপতি গভীর শ্রদ্ধার সাথে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্মরণ করেন।
প্রধানমন্ত্রীর বাণী
বাসস আরো জানায়, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, জাতির পিতার ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণকে বিশ্বপ্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকেই স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
গত বছরের ৩০ অক্টোবর জাতির পিতার ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণকে বিশ্বপ্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয় জাতিসঙ্ঘের শিক্ষা বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো। এ জন্য সমগ্র দেশ ও জাতি গর্বিত উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমি বাংলাদেশ সরকার এবং বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে ইউনেস্কোর সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। এই স্বীকৃতির মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকেই স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।’ প্রধানমন্ত্রী আজ ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ উপলক্ষে গতকাল দেয়া এক বাণীতে এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী তার বাণীতে বলেন, ‘সরকার জাতির পিতার অসমাপ্ত কাজগুলো বাস্তবায়ন করছে। তিনি যে সোনার বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, বাঙালি জাতির জন্য যে উন্নত জীবনের কথা ভেবেছিলেন, তার সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেয়া হচ্ছে।’
প্রধানমন্ত্রী সব ভেদাভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশের উন্নয়নে কাজ করা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে সমুন্নত রাখার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘আসুন সকলে মিলে একটি অসাম্প্রদায়িক, ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত ও সুখী সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলি। প্রতিষ্ঠা করি জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ। ঐতিহাসিক ৭ই মার্চে এই হোক আমাদের অঙ্গীকার’। সূত্র: দৈনিক নয়াদিগন্ত

 

আপনার মন্তব্য লিখুন

আর্কাইভ

May 2024
M T W T F S S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031  
আরও পড়ুন